প্রকৌশলী মোঃ নাজমুল হুদা মাসুদ:
গণতন্ত্রের শক্তি নির্ভর করে জনগণের ভোটাধিকার প্রয়োগের ওপর। সেই অধিকার সুরক্ষিত রাখার প্রধান উপায় হলো অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ নির্বাচন। দীর্ঘদিন ধরে নির্বাচনের নিরাপত্তা বলতে আমরা বুঝে এসেছি ভোটকেন্দ্রের শৃঙ্খলা, ব্যালট বাক্সের পাহারা কিংবা ভোট গণনার স্বচ্ছতা। কিন্তু সময় বদলেছে, বদলেছে নির্বাচন ব্যবস্থার চরিত্রও। আধুনিক রাষ্ট্রব্যবস্থায় নির্বাচন আর কেবল ব্যালট বাক্সে সীমাবদ্ধ নেই; এটি এখন একটি প্রযুক্তিনির্ভর, বহুমাত্রিক ও জটিল প্রক্রিয়া। আর সেই পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে ব্যালটের ছায়ায় নীরবে লুকিয়ে পড়েছে এক নতুন হুমকি—সাইবার ঝুঁকি।
বর্তমানে ভোটার তালিকা প্রণয়ন, জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক তথ্য সংরক্ষণ, ফলাফল ব্যবস্থাপনা, নির্বাচন-সংক্রান্ত তথ্য প্রচার—সবই কোনো না কোনোভাবে ডিজিটাল অবকাঠামোর ওপর নির্ভরশীল। এই নির্ভরতা একদিকে যেমন প্রশাসনিক দক্ষতা ও দ্রুততা বাড়িয়েছে, অন্যদিকে তেমনি তৈরি করেছে নতুন ঝুঁকির ক্ষেত্র। ডিজিটাল ব্যবস্থায় সামান্য দুর্বলতা থাকলেই পুরো নির্বাচন প্রক্রিয়া প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
বিশ্বব্যাপী অভিজ্ঞতা এই আশঙ্কাকে বাস্তব প্রমাণে পরিণত করেছে। বিভিন্ন দেশে নির্বাচনকালীন সময়ে ভোটার ডাটাবেজে অনুপ্রবেশ, ফলাফল ব্যবস্থায় বিঘ্ন, সরকারি ওয়েবসাইট অচল করে দেওয়া (ডিডিওএস আক্রমণ), কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিকল্পিত গুজব ও অপপ্রচারের ঘটনা ঘটেছে। অনেক ক্ষেত্রেই এসব হামলার উদ্দেশ্য ভোটের ফল সরাসরি পরিবর্তন করা নয়; বরং নির্বাচন প্রক্রিয়ার ওপর জনগণের আস্থা নষ্ট করা। কারণ আস্থা নষ্ট হলেই একটি নির্বাচন কার্যত ব্যর্থ হয়ে যায়, ফল যা-ই হোক না কেন।
একটি নির্বাচন তখনই সফল হয়, যখন ভোটাররা বিশ্বাস করেন যে তাঁদের ভোট নিরাপদ এবং ফলাফল নিরপেক্ষ। কিন্তু যদি ভোটারদের মনে হয় ভোটার তালিকা সুরক্ষিত নয়, ফলাফল ব্যবস্থায় কারসাজির সুযোগ রয়েছে কিংবা তথ্যের স্বচ্ছতা নেই, তাহলে সেই নির্বাচন গ্রহণযোগ্যতা হারায়। এই আস্থার সংকটই সাইবার হুমকির সবচেয়ে বড় লক্ষ্যবস্তু।
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে বিষয়টি বিশেষ গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। দেশ দ্রুত ডিজিটালাইজেশনের পথে এগোলেও সাইবার নিরাপত্তা প্রস্তুতি এখনও সেই গতিতে দৃশ্যমান হয়নি—এমন অভিযোগ অমূলক নয়। জাতীয় পরিচয়পত্রভিত্তিক ভোটার তালিকা, নির্বাচন কমিশনের সার্ভার, ফলাফল ব্যবস্থাপনা সফটওয়্যার—সবকিছুই সম্ভাব্য সাইবার আক্রমণের ঝুঁকিতে রয়েছে। অথচ নির্বাচন সামনে রেখে এসব ব্যবস্থার নিরাপত্তা নিয়ে জনসমক্ষে সুস্পষ্ট ও আশ্বস্তকারী প্রস্তুতির বার্তা এখনও পর্যাপ্তভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এখানে একটি বিষয় স্পষ্টভাবে বলা দরকার—নির্বাচনের নিরাপত্তা আর শুধু মাঠপর্যায়ের আইনশৃঙ্খলা রক্ষার বিষয় নয়। অতীতে ভোটকেন্দ্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েনই ছিল প্রধান নিরাপত্তা ব্যবস্থা। কিন্তু বর্তমান বাস্তবতায় ডিজিটাল দুর্বলতা থাকলে মাঠপর্যায়ে শতভাগ নিরাপত্তা নিশ্চিত করেও একটি নির্বাচন প্রশ্নমুক্ত রাখা সম্ভব নয়। সাইবার আক্রমণ অদৃশ্য, নীরব এবং অত্যন্ত কৌশলী; কিন্তু এর প্রভাব গভীর ও দীর্ঘস্থায়ী।
তাই নির্বাচনকে প্রশ্নবিদ্ধ হওয়ার আগেই সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এখন সময়ের কঠোর দাবি। প্রথমত, নির্বাচন সংশ্লিষ্ট সব ডিজিটাল সিস্টেমের জন্য শক্তিশালী ও আধুনিক সাইবার সুরক্ষা অবকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। নিয়মিত ও স্বাধীন নিরাপত্তা অডিট, পেনিট্রেশন টেস্টিং এবং আন্তর্জাতিক মানের ফায়ারওয়াল ও এনক্রিপশন ব্যবস্থার ব্যবহার নিশ্চিত করা জরুরি। কেবল প্রস্তুতির ঘোষণা নয়, বাস্তব সক্ষমতার প্রমাণই এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও সাইবার নিরাপত্তা সংস্থার মধ্যে কার্যকর সমন্বয় নিশ্চিত করতে হবে। নির্বাচনকালীন সময়ে একটি সমন্বিত সাইবার রেসপন্স টিম থাকা অপরিহার্য, যারা যেকোনো ডিজিটাল হুমকির ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে ও কার্যকর প্রতিক্রিয়া জানাতে সক্ষম হবে। প্রযুক্তিগত সমস্যার সমাধানে বিলম্ব মানেই গুজব ও বিভ্রান্তির সুযোগ সৃষ্টি করা।
তৃতীয়ত, মানবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির বিষয়টি উপেক্ষা করা যাবে না। আধুনিক প্রযুক্তি থাকলেই সাইবার নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না; দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনবল ছাড়া এসব প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহার সম্ভব নয়। নির্বাচন কমিশনের কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ নির্বাচনকালীন দায়িত্বে থাকা সংশ্লিষ্টদের জন্য নিয়মিত সাইবার সচেতনতা ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি জোরদার করা প্রয়োজন।
একই সঙ্গে সাধারণ নাগরিকদেরও ডিজিটাল সচেতনতা বাড়াতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো গুজব ও ভুয়া তথ্য শনাক্তে জনগণ সচেতন না হলে অপপ্রচার সহজেই প্রভাব ফেলতে পারে। সঠিক তথ্য দ্রুত ও দায়িত্বশীলভাবে প্রকাশ না করলে মিথ্যাই জায়গা করে নেয়—এ বাস্তবতা অস্বীকার করার সুযোগ নেই।
সবশেষে বলা যায়, নির্বাচন একটি দিনের আয়োজন হলেও এর প্রস্তুতি ও নিরাপত্তা একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সাইবার নিরাপত্তাকে অবহেলা করলে শুধু একটি নির্বাচন নয়, পুরো গণতান্ত্রিক ব্যবস্থাই ঝুঁকির মুখে পড়ে। তাই ব্যালট বাক্সের নিরাপত্তার পাশাপাশি ব্যালটের ছায়ায় লুকিয়ে থাকা সাইবার ঝুঁকিকেও সমান গুরুত্ব দিয়ে মোকাবিলা করাই এখন সময়ের দাবি।
লেখকঃ প্রকৌশলী মোঃ নাজমুল হুদা মাসুদ, মেইন্টেইন্যান্স ইঞ্জিনিয়ার | সাইবার সিকিউরিটি এনালিস্ট (SB-CIRT)
ও জয়েন্ট সেক্রেটারি (একাডেমিক), বাংলাদেশ কম্পিউটার সোসাইটি